কক্সবাজার সৈকতের অন্য এক রুপ

79

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আবার ফিরে আসছে ডলফিনের ঝাঁক। বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতের বালুচরের তীরে বসেই দেখা মিলছে জোয়ারের পানিতে ডলফিনের কসরত। অন্তত তিন-চার দশক পরেই সমুদ্র সৈকতের সেই প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে স্থানীয় লোকজন অত্যন্ত খুশি। এমন দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা সৈকতের পানিতে এখন থেকে গোসলসহ পর্যটকদের নৌযানে বেড়ানো নিয়ন্ত্রণ করারও তাগিদ দিয়েছে।

জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে কক্সবাজার সৈকতের একদম তীরবর্তী স্থানেই দেখা মিলছে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিনের। সর্বপ্রথম গত সোমবারই ডলফিনের একটি বিশাল ঝাঁক দেখা যায়। কলাতলি সৈকতে সেদিন সকাল আনুমানিক ১১টা থেকে দুপুর নাগাদ কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ডলফিনের ঝাঁকটি সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে কসরত করেছিল। এমনকি ডলফিনের ঝাঁকটি সেদিন সৈকতের একদম কাছকাছি এলাকায় এসেও খেলাধুলায় মেতে উঠে।

এমন বিরল দৃশ্য দেখে সাগর পাড়ের হোটেলে অবস্থানকারী অনেকেরই যেন আনন্দের সীমা ছিল না। এমনকি সাগরের পানিতে ডলফিনের লাফালাফির দৃশ্য দেখে স্থির থাকতে পারেননি তারকামানের হোটেল সায়মান বীচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি বিশেষ নৌযান নিয়ে নেমে পড়েন সাগরে। ডলফিনের লাফালাফির ভিডিও ধারণ করেন তিনি। সেই ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে।

হোটেল সায়মান বীচ রিসোর্টের ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি এই হোটেলে কর্মরত। কিন্তু এর আগে এরকম মজার দৃশ্য চোখে পড়েনি।’

তিনি বলেন, সাগর পাড়ের হোটেলগুলোতে পর্যটকরা উঠেন কেবলমাত্র ফেনিল ঢেউ অবলোকন করার জন্য। সাগরের পানিতে এরকম ডলফিনের লাফালাফি দেখা গেলে বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ের কারণে এখানে স্থান সংকুলানেও রীতিমতো কষ্ট হবে।

কক্সবাজার সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির নিয়োজিত ‘বীচ কর্মী’ খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে কয়েকবার দেখা গেছে ডলফিনের ঝাঁক। তিনি জানান-‘আমি গত ১৬ বছর ধরে সৈকতে কাজ করছি। কিন্তু এর আগে এখানে এরকম ডলফিনের ঝাঁক দেখতে পাইনি। মাঝে মধ্যে যা দেখতাম বড়জোর একটি।’ কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান জানান, তিনিও গত এক সপ্তাহ ধরে সৈকতের তীরবর্তী এলাকায় ডলফিনের লাফালাফি দেখেছেন।

এসব বিষয়ে কক্সবাজারস্থ বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান গতকাল শুক্রবার বলেন-‘সৈকতে ডলফিনের ঝাঁকের উপস্থিতির কথা প্রথমে শুনে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি যে, ব্যাপারটি সত্যি। মনে হচ্ছে, আবার আমাদের সুদিন ফিরে আসছে।’ তিনি বলেন, তিনটি কারণেই ডলফিন কক্সবাজার সৈকতে ফিরে আসতে শুরু করেছে।

এসব কারণগুলোর বিবরণ দিয়ে ড. শফিক জানান, সাগর তীরবর্তী যেসব ককারখানা রয়েছে সেগুলো এখন বন্ধ। তাই কারখানার কারণে সাগরের দূষণ নেই। সাগরে হাজার হাজার পর্যটকের ব্যবহার না থাকায় পানি এখন স্বচ্ছ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে নির্মল পরিবেশেরও সৃষ্টি হয়েছে। তদুপরি জেলেদেরও উৎপাত আগের মতো না থাকায় ডলফিনের খাবারেরও যোগান বেড়েছে তাই এসব প্রাণীর বিচরণ এদিকে বেড়ে গেছে।

তিনি আরো জানান, কক্সবাজার সৈকতে যে ডলফিন দেখা গেছে, এগুলো হামব্যাক বা গোলাপী ডলফিন। সুন্দরবনসহ কক্সবাজার উপকূলে এ প্রজাতির কমপক্ষে ২০০টি ডলফিন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

এদিকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের পদক্ষেপ হিসাবে গত ২০ মার্চ থেকে সৈকতে পর্যটক সমাগম বন্ধ করে দেওয়া হয়। টানা গত ৮ দিন ধরে সৈকতে কোনো পর্যটকের ভিড় নেই। সৈকতে গোসল করারও নেই কেউ। সাগরের পানিতে নেই পর্যটকদের সাঁতার কাটার কিটকটসহ স্পিডবোট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি।

এসব কারণে সৈকত হয়ে পড়েছে এখন জনমানবহীন এলাকা। দোকানপাট বন্ধ থাকায় কোনো হাঁকডাক পর্যন্ত নেই। তদুপরি সাগরে গোসলসহ হাজার হাজার পর্যটকের উৎপাত না থাকায় ফিরে এসেছে আগের সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে বিগত ৩০/৪০ বছর ধরে এরকম ডলফিনের ঝাঁক আর দেখা যায়নি। কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিনস দ্বীপ থেকে মহেশখালী পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে এসব ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্র।

Leave A Reply

Your email address will not be published.