আজ থেকে সব বন্ধ

131

ঢাকা: বিশ্বের অনেক দেশই নভেল করোনাভাইরাস ১৪ দিন, ২১ দিন অথবা অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘লকডাউন’ ঘোষণা করেছে পুরো দেশ। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে আজ বৃহস্পতিবার থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১০ দিন দেশে জরুরি সেবা, পণ্য পরিবহন, নিত্যপণ্য ও ওষুধের দোকান ছাড়া প্রায় সব কিছুই বন্ধ থাকবে। এ সময় মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা কার্যকরের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার।

গত মঙ্গলবার থেকে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে সামাজিক দূরত্ব ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে সশস্ত্র বাহিনী মাঠে নেমেছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী করোনাভাইরাসসংক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাব্যবস্থা, সন্দেহজনক ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে। বিশেষ করে বিদেশফেরত ব্যক্তিদের কেউ নির্ধারিত কোয়ারেন্টিনের বাধ্যতামূলক সময় পালনে ত্রুটি/অবহেলা করছে কি না তা পর্যালোচনা করবে। গতকাল জাতির উদ্দেশে ভাষণে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সবাইকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ সমগ্র বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে। তবে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের সরকার প্রস্তুত রয়েছে। ১৯৭১ সালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবেলা করে বিজয়ী হয়েছি। করোনাভাইরাস মোকাবেলাও একটা যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আপনার দায়িত্ব ঘরে থাকা। আমরা সবার প্রচেষ্টায় এ যুদ্ধে জয়ী হব, ইনশাআল্লাহ। আবারও বলছি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সবাই যাঁর যাঁর ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।’

সরকারি-বেসরকারি অফিস ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সব আদালতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষের স্থানান্তর বন্ধ রাখতে বাস, ট্রেন, নৌযান, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে প্রয়োজন অনুসারে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য জরুরি সেবাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে। সীমিত পরিসরে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা ব্যাংকও খোলা থাকবে।

কয়েক দিন ধরে রাজধানীও অনেকটা ফাঁকা। বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গণপরিবহনও অনেকটাই কম। প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়েও কেউ বের হচ্ছেন না। এরপর সেনাবাহিনী মাঠে নামায় মানুষের স্থানান্তর আরো অনেকটা কমে এসেছে। ঢাকার বাইরেও সেনাবাহিনীর টহলে অনেকটাই ঘরমুখী হচ্ছে মানুষ।

তবে গতকালও ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ভিড় ছিল। সরাসরি বাস চলাচল অনেকটাই বন্ধ থাকায় অনেককেই লোকাল গাড়িতে ঢাকা ছাড়তে দেখা যায়। দূরপাল্লার যানবাহন না পেয়ে রিকশা-ভ্যান, পিকআপ অথবা পায়ে হেঁটেও অনেকে রওনা দেন। গতকাল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ৪০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয় বলে জানা যায়।

আজ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশের গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। তবে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ওষুধ, জরুরি সেবা, জ্বালানি, পচনশীল পণ্য পরিবহন এ নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। কিন্তু পণ্যবাহী যানবাহনে কোনো যাত্রী পরিবহন করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে। রাইড শেয়ারিং কম্পানিগুলোও এই ১০ দিন তাদের সেবা বন্ধ রাখা হবে বলে জানিয়েছে।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ করা হয়েছে ট্রেন যোগাযোগ। তবে মালবাহী ও তেলবাহী ট্রেন সীমিত পরিসরে চলাচল করবে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) গত মঙ্গলবার বিকেল থেকেই সারা দেশের নৌপরিবহন বন্ধ রেখেছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে অভ্যন্তরীণ রুটের সব ফ্লাইট আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। চারটি দেশ ও অঞ্চল ছাড়া বাকি সব দেশের ফ্লাইট আসা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে আগে থেকেই। এর মধ্যে দুটি দেশের ফ্লাইটও বন্ধ হওয়ার কথা রয়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে থাকায় সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়েছে। আগে ৩১ মার্চ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেটা এখন বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগেই ১ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতিও ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সব বিপণিবিতান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও নগদ লেনদেনের সুবিধার্থে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ব্যাংক খোলা থাকবে। এ সময় এটিএম বুথসমূহে পর্যাপ্ত অর্থ রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে গতকাল থেকে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। মানুষকে ঘরে থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়ে মাইকিং করছে স্থানীয় প্রশাসন।

ঠাকুরগাঁওয়ে সেনা সদস্যরা বিদেশফেরত নাগরিকদের হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা, জনসমাগম রোধ করা, বাজার মনিটরিংসহ নানা কাজে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করছেন। জেলার পাঁচ উপজেলায় ২৫০ জন সেনা সদস্যের দুটি কম্পানি টহল কাজ পরিচালনা করছে।

জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা প্রশাসন মাইকিং করে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঘর থেকে বের না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে। এরপর নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকান ছাড়া অন্যান্য বিপণিবিতান বন্ধ দেখা যায়। রাস্তাঘাটেও লোকজন খুব কম লক্ষ্য করা গেছে। সেনা সদস্যদের টহলের খবরে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে কম।

মাগুরায় গতকাল সকাল থেকেই বিপণিবিতান বন্ধ রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন স্থানে জনসমাগম রোধ, সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের স্বল্পসংখ্যক কিছু দোকান খোলা রয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ভিড়ও কমা শুরু হয়।

কক্সবাজারের রামুর ১০ পদাতিক ডিভিশনের চিকিৎসাদলসহ সেনা সদস্য জেলার পাঁচটিসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের আটটি উপজেলায় গতকাল থেকেই কাজ শুরু করেছেন। সেই সঙ্গে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবিরেও কাজ করছে তাঁরা। রাজবাড়ী, ফরিদপুর, খুলনা, পঞ্চগড়, নাটোর, নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও গতকাল থেকে কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী। সূত্রঃ কালের কণ্ঠ

Leave A Reply

Your email address will not be published.