ভাষা সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি – দৈনিক প্রথম আলো

0

ঢাকা: ভাষা রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে তরুণদের। ১৯৫২ সালে যে আন্দোলনটা হয়েছিল, তার পুরোভাগে ছাত্ররাই ছিলো। রাজনৈতিক দলগুলো তো ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষেই ছিল না। ছাত্ররাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে।

২১ ফেব্রয়ারি, মঙ্গলবার ‘ভাষাসংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি’ শীর্ষক শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবরে এমনটাই বলা হয়েছে।

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনের মূল ছবিগুলো তুলে ঠাঁই করে নিয়েছেন ইতিহাসে। বললেন, ‘দেখো, রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংবিধানস্বীকৃত। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রচলন তো নেই কোথাও। নতুন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার দায়িত্ব তো ছাত্রসমাজেরই। ওরাই তো প্রশ্ন তুলবে, কেন আমাদের দোকানপাটের নাম ইংরেজি হরফে হবে?’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনারের নকশাকার ডা. সাঈদ হায়দার, ‘রফিক ভাই বলতে চাইছেন, ভাষা আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে কিন্তু ভাষাসংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। সে সংগ্রামটা তোমাদের চালিয়ে নিতে হবে।’

তাদের আক্ষেপের কথা এল এভাবে, ‘এই যে আমাদের এখন যেসব সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, বৌভাত, গায়েহলুদ, জন্মদিন সমস্ত আমন্ত্রণপত্র কিন্তু ইংরেজিতে লেখা। অথচ পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে আমরা বাংলা প্রচলন প্রায় করে ফেলেছিলাম।’

‘একটা দোকানের সাইনবোর্ডও ইংরেজিতে লেখা ছিল না। এসব আমন্ত্রণপত্র বাংলায় দেওয়া হতো। গাড়ির নম্বরপ্লেট পর্যন্ত বাংলায় লেখা শুরু হয়ে গিয়েছিল। সাংবাদিক এবিএম মূসা তার গাড়ির নম্বরপ্লেট বদলে নিয়ে প্রথম বাংলা করলেন।’

দুর্ভাগ্যজনক যে পাকিস্তান আমলে আমরা যতটা অর্জন করেছিলাম, স্বাধীনতার চার দশক পরে এসে দেখি যে সেগুলো নেই। এই সামাজিক হীনম্মন্যতা দূর করতে পারে আমাদের তরুণসমাজ।’

তারপরও তারা যে হতাশ নন, তা বোঝা যায় সাঈদ হায়দারের কথায়, ‘আমরা কিন্তু আশাবাদী। এটা হবে যদি এখনকার তরুণসমাজ সচেতন হয়।

ইডেন মহিলা কলেজের আছমা আকতারের সরল জিজ্ঞাসা, ‘সচেতন কীভাবে হব? বাড়িতে তো বাড়ির ভাষা বলবে, বাজারে বলবে বাজারের ভাষা, পথে পথের ভাষায় কথা বলবে। কিন্তু ক্লাসরুমে, বেতারে…দ্যাখো, এফএম রেডিওতে বলা হচ্ছে এখন একটা সং শুনব। সং-এর কি কোনো বাংলা নেই আমাদের? আমরা কি কোনো দিন গান শুনিনি?’

শিক্ষার্থীরা এখন অতীতের কথা শোনার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ‘স্যার, আমরা জানি আপনি ভাষা আন্দোলনের ছবি তুলেছিলেন’ রফিকুল ইসলামকে শিক্ষার্থী জেরিনের প্রশ্ন।

এরপর তারা ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ব্যাখ্যা করলেন। ১৯৪৮ সালে প্রথম যে পাকিস্তান গণপরিষদের যে অধিবেশন হয়, সেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা উর্দু হবে বলে যে প্রস্তাব আনেন, তার বিপরীতে কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর সঙ্গে বাংলার কথাও বলেছিলেন।

হাসতে হাসতে রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘মানুষের মুখের ভাষা পাকিস্তান গণপরিষদে স্থান পেল না। ফলে কি হলো জানো, গণপরিষদের অধিবেশন শেষে সদস্যরা যখন করাচি, দিল্লি, কলকাতা হয়ে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজে ঢাকায় ফিরে এলেন, তখন এয়ারপোর্টে আমাদের প্রত্যেকের হাতেই জুতো। আমরা মুসলিম লীগ সদস্যদের জুতো দিয়ে আর ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলাম।’

এরপর তো মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা আগমন। এরপর ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দীনের ঘোষণা ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা কিন্তু পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকেই হরতাল, শোভাযাত্রা শুরু করলাম।

৪ তারিখে আমাদের প্রথম সভা হলো আমতলায়। ইতিমধ্যে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়ে গেছে। ৪ তারিখে সিদ্ধান্ত হলো, ২১ তারিখে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসবে এবং ওই দিনই আমরা রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করব, হরতাল হবে এবং আমরা স্মারকলিপি দেব।’

এরপরের ইতিহাস সবার জানা। তারপরও শিক্ষার্থীরা নিমগ্ন হয়ে শুনতে থাকে। ভাষা সংগ্রামীরা শুরুতেই বলেছিলেন, ভাষা আন্দোলন শেষ হয়েছে কিন্তু ভাষাসংগ্রাম শেষ হয়নি। এ কথাটা নতুন প্রজন্মের তরুণেরা বুঝতে পারে। বিদায়ের সময় ওরা জানিয়ে দেয়, এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি ওদের জন্য নতুন এক অনুভূতি আর ভালোবাসা নিয়ে আসবে।

Share.

About Author

Leave A Reply

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com